
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এল/এ) শাখার সার্ভেয়ার কমল দেবনাথের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন অভিযোগ সূত্র, ভুক্তভোগী এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রেষণে কর্মরত থাকলেও বছরের পর বছর একই শাখায় বহাল থেকে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এলএ কেস নং-১৬/২০১৭-২০১৮ (মৌজা: চর বলিয়াতলী) এর আওতায় প্রায় ৪ কোটি টাকার সম্পত্তি ভুয়া ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামে দেখিয়ে আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে সার্ভেয়ার কমল দেবনাথ ও তার সহযোগী হিসেবে পরিচিত ফারুকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ঢাকা, নরসিংদী ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে কমল দেবনাথের আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বরিশালে নির্মাণাধীন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একটি পাঁচতলা ভবন, পটুয়াখালী শহরে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নিজ জেলায় কোটি টাকার বেশি মূল্যের ভূমি সম্পত্তি, আত্মীয়-স্বজনের নামে বেনামি সম্পদ এবং পায়রা বন্দর এলাকায় অধিগ্রহণকৃত মূল্যবান জমির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের অভিযোগ উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া পটুয়াখালী ডিসি অফিসের এল/এ শাখার কানুনগো আফজাল হোসেন, সার্ভেয়ার কমল দেবনাথ ও খালিদকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্র সাধারণ জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড়িয়ে দেওয়ার নামে বিভিন্নভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে থাকে।
এলএ কেস নং-১৬/২০১৭-২০১৮ এর চর বলিয়াতলী মৌজার খতিয়ান নং ২৯২, ৩০০, ৩৮৩, ৩৮৪, ৩৮৭, ৩৯০, ৩৯১, ৪০২, ৪০৬, ৪০৭, ৪০৮, ৪০৯ ও ৪১২ সংক্রান্ত তথ্য জানতে সার্ভেয়ার কমল দেবনাথের কাছে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সুস্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল গ্রহণ করেননি।
অভিযোগকারীদের দাবি, উক্ত কেসের মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি টাকার সম্পত্তি অধিগ্রহণে গুরুতর অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি পবিত্র ঈদুল আজহার আগে আপত্তি ও মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও ইটবাড়িয়া তলী মৌজার ১৩৬ নম্বর খতিয়ানের বিপরীতে ২ কোটি ৩ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণের চেক প্রদান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ প্রক্রিয়ায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কানুনগো আফজাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঢাকা থেকে উপরমহলের তদবিরের কারণে চেকটি প্রদান করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বর্তমানে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এল/এ) শাখায় কমল দেবনাথ তার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মীকে নিয়ে প্রভাব বিস্তার করে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পটুয়াখালীতে একাধিক জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করলেও এবং বিভিন্ন সার্ভেয়ার ও কানুনগো বদলি হলেও কমল দেবনাথকে স্থায়ীভাবে সরানো যায়নি। তাকে একাধিকবার বিভিন্ন উপজেলা ভূমি অফিসে বদলি করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি পুনরায় পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এল/এ শাখায় যোগদান করেন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রেষণে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও বারবার একই শাখায় ফিরে এসে তিনি প্রভাব বিস্তার করছেন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সংশ্লিষ্ট কেসগুলো তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
(চলবে…)
পরবর্তী পর্বে ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অভিযোগের পক্ষে উপস্থাপিত বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রকাশ করা হবে।